Posts

জ্বরের ঘোর এবং একটা দৃশ্যপট

Image
  ঘুম, তন্দ্রা কিম্বা ঘোর --- এক অদ্ভুত অবস্থা। এমন কিছু চোখের সামনে ঘোরাফেরা করে যার কোন আপাত ব্যাখ্যা মাথায় আসে না। জ্বরে পড়েছিলাম এই কদিন, গা-হাত-পা-মাথা ব্যাথা। এগুলো কোন সমস্যা নয়। বেশ আদর এবং সেবা পাওয়া যায়। একদিক থেকে ভালোই লাগে। সমস্যা হয় যখন জ্বর ১০১ এর ওপরে উঠে যায়। মনে হয় চোখ-মুখ দিয়ে আগুনের হলকা বের হচ্ছে, পাশাপাশি বাকি শরীর ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে। আমি তখন এক ঘোরে চলে যাই। বাস্তব আর কল্পনার মাঝামাঝি অবস্থা । এবং সেই ঘোরের মধ্যে অদ্ভুত কিছু জিনিস দেখতে থাকি। এবারে তিনবার এমনই এক ঘোরে চলে গিয়েছিলাম। এবং তিনবারই, অদ্ভুতভাবে, একই জিনিস দেখলাম। দেখলাম এক অন্ধকার পৃথিবী। তার মাঝে আলোর পথ। সে পথ কালোয় মিশেছে দূরে বহুদূরে। আমাকে যেতে হবে এই আলোর পথ ধরে। দূরে কোথাও যেন আগুন জ্বলছে। সে আগুন নরম আলোর আগুন, না ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী আগুন বোঝার উপায় নেই। আমার সেখানে যেতে ভয় করছে। বুঝতে পারছি না, আমার যাওয়া উচিৎ হবে কি হবে না, গেলে ধ্বংস অনিবার্য, না কি অন্য কিছু আমার জন্যে অপেক্ষা করছে? অথচ আশেপাশের অন্ধকারের মাঝে এড়িয়ে যাওয়ার পথ খোলা নেই। আমি প্রতিবারই এই ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে ঘেমে-...

বাটখারার মাঠ, তেপান্তরের মাঠ

Image
         লোকে বলে বাটখারার মাঠ, আমি বলি তেপান্তরের মাঠ। এর মাঝখানে দাঁড়ালে, যতদূর চোখ যায়, মনে করুন চৈত্রের দুপুরে, দেখবেন ধু ধু করা এক মাঠ। একচিলতে ছায়া মেলা ভার। মাটি থেকে ওঠা ভাপে তখন মরিচীকা দেখা যায় চারদিকেই। মনে হয় যেন মাঠ আর মাঠ নেই, সে যেন জলের মধ্যে জেগে থাকা দ্বীপ। আর দেখা যায়, কপাল ভাল থাকলে, আলপথের আবডালে বাটখারাদের।       প্রধানত দুই রকমের বাটাখারা আছে --- গোখরো আর চন্দ্রবোড়া। কয়লা ওজন করতে বড়ো বড়ো বাটখারা যেমন হয়, তেমনভাবেই কুন্ডলী পাকিয়ে এরা পড়ে থাকে। মেঠো ইঁদুরের যম। এবং মানুষের। এই মাঠের মাঝখানে যদি গোখরো চুমু দেয়, মাঠ পেরিয়ে বড়ো রাস্তায় আসার আগেই অনেকের ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছে এমন উদাহরণ বিস্তর। কত মানুষ, গোরু, ছাগল, কুকুর, শেয়াল যে মাঠের মাঝেই পড়ে মারা গেছে, দিনের শেষে খোঁজপার্টি না বেরোলে জানার যো থাকে নেই। চন্দ্রবোড়ার ছোবলে মৃত্যু বড়ো করুন। আস্তে ধীরে বিষ ছড়ানোর যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে প্রায় প্রতি বছরই কেউ না কেউ মারা গেছে। তেপান্তরের মাঠের আশেপাশের গ্রামে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি। তব...

এই যে ছুটি

Image
  এই যে ছুটি ======== আমার ছুটি নিরালাতে, আমার ছুটি ঘর ছাড়িয়ে আমার ছুটি অচিন গ্রামের অচিন মাঠে দিক হারিয়ে। যেখান থেকে এক নিমেষে দিগন্তলীন তেপান্তর,  যেখানেতে সবই ধূ ধূ, আকাশ-মাটি, নেই চরাচর। সেই মাঠেরই আলের ওপর, আমার ছুটি এক লহমায়, গাছের ফাঁকে চোখ চলে যায়, সূর্য ডোবার নিবিড়তায়। সেই গ্রামেতে ফিরছে গরু, ফিরছে মানুষ কাস্তে হাতে ঘুরছে শেয়াল বন বাদাড়ে, সরষে ক্ষেতের ইশারাতে। আমার ছুটি, ঠিক তখনই, হতভাগার বুকের মাঝে।  এক শালেতে জড়াজড়ি, নিবিড় করে, শীতের সাঁঝে।  আমার ছুটি এই অবেলায়, হঠাৎ করেই, কোলের কাছে  আমার ছুটি এমন করেই, তোমার কাছে, তোমার মাঝে।

শুভ্রঃ হুমায়ূন আহমেদের আখরকথাঃ শেষ পর্ব

Image
  হুমায়ূন আহমেদকে ধন্যবাদ। কারণ, যে হুমায়ূনকে আমি দেখতে অভ্যস্ত, একেবারে সেই হুমায়ূন স্বমহিমায় বিদ্যমান এই উপন্যাসে। উপন্যাসের নাম ‘শুভ্র গেছে বনে’। এবং, এই প্রথম, মনে হচ্ছিল, শুভ্রকে হুমায়ূন তৈরী করে নি, শুভ্র হুমায়ূনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে আপন ছন্দে। এই উপন্যাসের প্রথম থেকে সব চরিত্রকেই মনে হচ্ছে জীবন্ত, আনপ্রেডিক্টেবল এবং হুমায়ূনোচিত। সম্ভবত, ২০০৩ সালে যখন ‘এই শুভ্র এই’ উপন্যাস শেষ করেন, তখনই বুঝতে পারেন, এভাবে কোন শুদ্ধতম মানুষ সৃষ্টি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এ তার কাজ নয়। তারপর মনে হয় তিনি শুভ্রকে নিয়ে লেখার কথাই ভুলে গেছেন। তার আরেকটা কারণ হতে পারে, ‘হিমু’ এবং ‘মিসীর আলী’ সাহেবের তুমুল জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে হিমু একটা কাল্ট সৃষ্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে ততদিনে। আর শুভ্র তেমন করে পাঠকমানসে জমাট বাধতে অক্ষম। ফলে, সাত বছর পর, ২০১০ সালে শুভ্র যখন আবার বের হয়ে এল তার কলম থেকে, তখন সেটা এল কোনরকম কোন এক্সপেক্টেশান ছাড়াই। সাত বছর! এবং, এই উপন্যাসের মুখবন্ধে হুমায়ূন লিখছেন, “শুভ্রর মতো কাউকে কি আমি চিনি, যাকে এই বই উৎসর্গ করা যায়? না, চিনি না। প্রকৃতি শুদ্ধতম মানুষ তৈরী করে না। কিছু-না-কিছু খাদ...

শুভ্রঃ হুমায়ূন আহমেদের আখরকথাঃ চতুর্থ পর্ব

Image
  ‘শুভ্র’ উপন্যাসের তিন বছর পর, ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘এই শুভ্র এই’। এবং, বলা ভাল, এই প্রথম আমি শুভ্র উপন্যাসকে এক ছিমছাম মেদবর্জিত, বাহুল্যবর্জিত রূপে দেখতে পাচ্ছি। হুমায়ূন তার লেখকসত্ত্বার চরম উচ্চতা থেকে লিখছেন। এবং এই প্রথম তার শুভ্র সিরিজের সব চরিত্রগুলোই হেটে-চলে বেড়াচ্ছে। এখানে শুভ্রর বাবা অনেক বেশি খোলামেলা। লাইট এন্ড ডার্কনেসের শেড অনেক বেশি বিদ্যমান। শক্তের ভক্ত, নরমের যম টাইপের। এমন মানুষটি পরিবারের অন্দরমহলে সবার সাথেই বেশ কমিউনিকেট করে চলেন। পরিবারের একজন কর্তামানুষ যেমন হয় আর কি। এখনও পর্যন্ত যে চরিত্র প্রথম থেকেই প্রাউ একই রকম গহীন ও জটিল চরিত্রে অবস্থান করছে, তিনি হলেন জাহানারা, শুভ্রর মা। আগের উপন্যাসগুলোর মতো এই উপন্যাসেও তাকে চিনতে একটুও ভুল হয় না। বরং যে ধরনের কাজ তিনি করে চলেছেন, সেটা তারই সাজে। আমার মনে হয় বিনুর চরিত্রের খানিক অংশ এখানে সকিনা এবং মিতুর চরিত্রের খানিকটা রুনুর মধ্যে দিয়ে চলে এসেছে এই উপন্যাসে। মূল গল্প প্রায় একই। রূপবান যুবক। মেধাবী ও বুদ্ধিমান যুবক। অজাতশত্রু যুবক। প্রায় অন্ধ হতে চলা যুবক। কখনও কখনও আনপ্রেডিক্টেবল এবং সবশেষে আবিস্কার হয়, মা...

আয় ব্যাটা তুই চড়বি আমার হিরো সাইকেলে

Image
  জীবনে নিজের সম্পত্তি ঠিকঠাক রাখতে গেলে কত যে কান্ড করতে হয় তার ইয়াত্তা নেই। বড়ো বড়ো নেতারা সুইস ব্যাঙ্কে কিম্বা বন্ধুনীর বাড়ীতে টাকা রেখেও যেখানে ছাড় পান না সেখানে আমি তো এক অবলা মেয়েমানুষ। আমার দুঃখের কথা আর কি-ই বা বলি। কিন্তু তা বলে কি উঠেপড়ে লাগব না? নিশ্চই লাগব।            এই যেমন আমার সাইকেল। যেটাতে করে আমি বাজারে যাই, মাঠে-ঘাটে-হাটে-পথে চড়ে বেড়াই, সেই বাংলা ‘হিরো’ সাইকেলটার কথাই ধরুন না কেন। নীল লেডিজ সাইকেল। সুন্দর দেখতে। সামনে খাঁচা। পেছনে ক্যারিয়ার। নাম দিয়েছি --- সবেধন নীলমণি। এই সবেধন নীলমণিতে মাঝে মাঝে হতভাগাকেও ক্যারিয়ারে বসিয়ে তেপান্তরের মাঠে নিয়ে গিয়ে পিরীত করেছি। তার কোমরে টনটন করেছে রাস্তার সস্তা অবস্থার কারণে, কিন্তু আমার সাইকেল যেমন শক্ত, তেমনই পোক্ত রয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই আমার সাইকেলটা পরের হস্তগত হয়ে যায়। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করেন, ওরে! ভাই কি তোর পর? আমি বলব, মোটেই না। কিন্তু ভাই তো আমার শাড়ী-সালোয়ারে হাত দেয় না, কিম্বা লিপস্টিক-নেলপালিশে। তাহলে আমার সাইকেলেই বা হাত দেবে কেন? বেরোতে গিয়ে যদি দেখি, ভাই নেই, কিন্তু ভাইয়ের বাইকটা...

শুভ্রঃ হুমায়ূন আহমেদের আখরকথাঃ তৃতীয় পর্ব

Image
শুভ্র সিরিজের সবথেকে বড়ো উপন্যাস – শুভ্র। শুভ্র সমগ্রের নিরিখে ২২১ পাতার এক সুবৃহৎ আখ্যান। অর্থাৎ, হুমায়ূন আহমেদ শুভ্রকে নিয়ে রীতিমতো আদাজল খেয়ে লিখতে বসেছেন এই উপন্যাস। এই সময়ে তাকে যেন প্রতিপন্ন করতেই হবে শুভ্র একজন শুদ্ধ মানুষ। নচেৎ এতবড়ো উপন্যাস লেখার মানুষ উনি নন। সুবৃহৎ উপন্যাস লেখার স্টাইল ওনার নয়। বেশ কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন যদিও। কিন্তু, যে মানুষ জানেন, কীভাবে অল্প সময়ে, গুছিয়ে আসল কথাগুলো বলে ফেলা যায়, সেই মানুষ এত বেশি পাতা নেবেন না। এই উপন্যাসে এসে শুভ্রর বাবার নাম মোতাহার সাহেব (আগের উপন্যাসগুলিতে নাম ছিল ইয়াজউদ্দিন) এবং মায়ের নাম জাহানারা (আগের উপন্যাসগুলিতে নাম ছিল রেহানা)। মোতাহার সাহেবের চারিত্রিক গঠনের একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। দ্বারুচিনি দ্বীপ, রূপালী দ্বীপের ইয়াজউদ্দিনের সাথে কিন্তু মোতাহার সাহেবের অমিল আছে, মূলত তার পেশায়। এবং এই পেশাগত কারণেই কোথাও তার চরিত্রের দৃঢ়তা নষ্ট হয়েছে অনেকটাই। এমনকি ‘মেঘের ছায়া’ উপন্যাসের থেকেও কোথাও এই উপন্যাসে এসে শুভ্রর বাবাকে বেশ দুর্বল লাগে। তুলনায় জাহানারা একই রকমের রয়ে গেছেন। বরং জাহানারার শুভ্রকে নিয়ে যে উদগ্র আত্মকেন্দ্রি...