Posts

একই চরিত্র – ছায়ায় মায়ায় – অনেক চরিত্র

Image
  “’ অদ্বৈতসিদ্ধি ’ গ্রন্থটি সে সমাপ্ত করিয়াছে। ইহার কঠোর যুক্তিজাল সে আজিকালি অধ্যাপনা করে। এইসব অন্ধকার রাত্রির গর্ভের ভিতর বসিয়া সংশয় আসে, কে তাহার গ্রন্থ মনে রাখিবে? শতাব্দী অতিক্রান্ত হইবার পর কেহ ইহা পড়িবে কি? অথবা, ইহা একটা নামমাত্র বাঁচিয়া রহিবে? এত কঠিন বিতর্কবিন্যাস ভাবীকালের মানবকের উপযোগীতাবাদী মস্তিষ্কে প্রবেশ করিতে পারিবে? অথবা, সে শুধু একটা কিংবদন্তী হইয়া বাঁচিয়া রহিবে? ইহার বেশি কিছু নয়! কেহ বলিতে পারে না। কত মহামহোপাধ্যায়ের গ্রন্থ কালের বিবরে হারাইয়া গিয়াছে, এ গ্রন্থও সেইসব লুপ্তচিহ্ন গ্রন্থরাজির পন্থা অনুসরণ করিবে কি না, কোন্‌ ক্রান্তদর্শী তাহা বলিয়া দিতে পারে? ”       সন্মাত্রানন্দের ‘ছায়াচরাচর’ উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট চরিত্র মধুসূদন সরস্বতী এক পর্যায়ে এসে এমন একটা ভাবনা ভাবছেন। তিনি জীবদ্দশায় কিংবদন্তী হয়ে পড়েছিলেন, এতটাই যে, জ্ঞানী অদ্বৈতবাদী এই সন্ন্যাসী সম্পর্কে প্রচলিত ছিল, বেত্তি পারং সরস্বত্যাঃ মধুসূদনসরস্বতী। মধুসূদনসরস্বত্যাঃ পারং বেত্তি সরস্বতী।।       মধুসূদন সরস্বতীর জ্ঞানের সীমানা যে কোথায়, ...

প্রেমের খোঁজে

Image
  “ সময়ের সমস্ত চিহ্ন ইতিহাস তার পেটিকায় তুলে রাখে না। অনেক বাদ দিয়ে সামান্য কিছু সঞ্চয় ক’রে রাখে মাত্র। ইতিহাসের সেই সামান্য সঞ্চয় থেকে শুধু অস্পষ্ট একটা আদল ধরা পড়ে। শূন্যস্থানগুলি ভরাট করে নিয়ে সময়ের নবনির্মাণ ক’রে নেয় ইতিহাসাশ্রয়ী সাহিত্য। সেই নবনির্মানে সৃজনশীল কল্পনার মুক্ত পক্ষবিস্তার। ” লিখছেন সন্মাত্রানন্দ। কথা সত্য। তবু কি এইটাই শেষ কথা? না। আসল কথাটা এবার তিনি লিখছেন, “তবু কালের বিনির্মাণই ইতিহাসাশ্রয়ী সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। কালের মুকুরে আমাদের সমকালকে প্রতিবিম্বিত ক’রে মানব অস্তিত্ব ও সম্পর্কের শাশ্বত কেন্দ্রটিকে আবিস্কার করা এসব রচনার মুখ্য অভিলক্ষ্য।” খাঁটি কথা। আরেকটা কথা কিন্তু উনি উল্লেখ করলেন না, যেটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তা হল, ‘বিকৃতি’। কল্পনার উড়ানে ইতিহাসকে কতটা বিকৃত করছি, সেটা একটা বড়ো বিষয়। এতে করে পাঠক হয়তো কল্পনার ডানা মেলে অনেক কিছু চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে। কিন্তু কোন ইতিহাসবিদকে ডাকিয়ে ঐতিহাসিক লেখাগুলোকে ভালো করে ‘ স্ক্রুটিনি ’ করলে বোঝা যাবে কল্পনার ডানার দৈর্ঘ্যটি কতটাই বা বর্তমানের নিরিখে রচিত হচ্ছে; আর কতটাই ব...

কশেরুকার মালার বাঁধনে এক নাস্তিক পণ্ডিত

Image
  ইংরাজীতে ‘COMPACT’ বলে একটা শব্দ আছে। ‘নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা’ সেই অর্থেই কমপ্যাক্ট লেখা। ঝরঝরে, নির্মেদ এক উপন্যাস, যার জন্যে পড়াশোনা করতে হয়। ‘নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা’ গত চার বছরের অন্যতম জনপ্রিয় এবং আলোচনাপ্রিয় উপন্যাস। মাথা চটকিয়ে দেওয়া এমন আর কোন উপন্যাস এযাবৎ মনে পড়ে কি? না। অন্তত এতদিন ধরে সাধারণ পাঠকসমাজে এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে নি আর কোনও উপন্যাস। বর্তমানে এর ২৩-তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাসটির রহস্যময়তা, বিশেষত থ্রিলার উপাদান এবং রোমান্স উপাদান একে এক মহতী জায়গায় নিয়ে গেছে। আমার মতে, মাঝখান থেকে দর্শনের উপাদান মার খেয়ে গেছে। এর কারণ লেখক নন। পাঠক সমাজ। দর্শনের জায়গাগুলি নিয়ে সুগভীর আলোচনা তেমন করে আমার অন্ততঃ চোখে পড়ে নি। অধিকাংশ পাঠক সেই জায়গায় চোখ উলটে দিয়েছেন, অর্থাৎ, “শিশি-বোতলের জায়গাটা শক্ত ঠেকেছে”। পরিবর্তে এর রোম্যান্টিক আখ্যান এবং থ্রিলার উপাদান একে জনপ্রিয় করে তুলেছে। সাথে যুক্ত হয়েছে তিন সময়কালের ওভারল্যাপিং, যা বাংলা সাহিত্যে এযাবৎ কেউ করেন নি। এই ওভারল্যাপিং-এর জায়গাটাকে অনেকে রিলেটিভিটি, বিগ ব্যাং, ফিজিক্স ইত্যাদি শব্দ দিয়ে পুরণ করতে গিয়ে কৌতুহলে উপন্যা...

সময়কালের উজানে কতকগুলি ঢেউয়ের জল

Image
  একটি গাছ, একটি পাখি, একটি যন্ত্রণা, একটি রুমাল, একটি ছবি, একটি ঘড়ি, একটি চিঠি, একটি চিত্রলিপি, একটি সম্পর্ক এবং একটি ঘুমপুতুল। এই হল সাদিয়া সুলতানার কতকগুলি জিয়নকাঠি। দেশভাগ, দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধের যন্ত্রনাকাতর ক্যালাইডোস্কোপ। এই দিয়েই হয়েছে ‘উজানজল’-এর নির্মাণ। সাদিয়া সুলতানার মুন্সিয়ানা ঠিক কোথায়? কতকগুলি চিহ্ন, কতকগুলি আখর, কতকগুলি ইঙ্গিতের মধ্যে দিয়ে গল্পের ঠাস বুনোট। মেদবর্জিত গল্পগুলি তোমার, আমার এবং তাদের পুর্বপুরুষের, এসে পৌছচ্ছে আমাদের কাছে, আখরকথায়, উত্তরপুরুষের কাছে। আমাদেরকে, এখনও, চিহ্নিত করা হয় ‘ওপার বাংলার’ বলে, বাঙাল বলে, রিফিউজি’র জেনারেশান বলে। আমরা কি সম্পূর্ণ ভুলতে পেরেছি ওপার বাংলাকে? আমাদের বাবা কিম্বা ঠাকুর্দা-ঠাকুমার রক্তের মধ্যে থাকা ঘাসফুল-হিজলের গন্ধের ঢেউ কি আমার রক্তের মধ্যেও নেই? --- “নিজের দেশ ছেড়ে অন্যের দেশে রিফিউজি পরিচয়ে নতুন করে জীবন-জীবিকা শুরু করার দিনগুলোর স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে ভুবন মিত্র শাফায়েতকে মিহি গলায় কত কী বলছেন, মানুষটার অস্ফুট কণ্ঠস্বর ভেদ করে শাফায়েত সব শব্দ বুঝতে না পারলেও তার কন্ঠের অকৃত্রিম আবেগ ধরতে পারে।” আর শুধু কি আম...

রবীন্দ্রনাথঃ এক আদালতীয় টানাপোড়েনের সিদ্ধান্ত

Image
  “ যা কিছু অসাধারণ, তাকে ঘিরেই কিংবদন্তী গড়ে তোলার স্বভাব আমাদের। তা সে ঘটনাই হোক, কি কীর্তি। কখনও সেই কিংবদন্তী এমনই উচ্ছ্বসিত, যার প্রতাপে অসাধারণ হয়ে ওঠে অলৌকিক; কখনও আবার তা উৎসারিত এমনই ঈর্ষা-কুৎসা থেকে, যার প্রকোপে অসাধারণের প্রকৃত মহিমারও ঘটে যায় খর্বতা। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও বারবার এমন ঘটনা ঘটেছে। ” সৌরীন্দ্র মিত্রের লেখা ‘খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে’-র ব্লার্বের শুরুই হচ্ছে এই কথাকটা দিয়ে। তার এই বইয়ের মূল বিষয়বস্তু একজনই --- রবীন্দ্রনাথ। তিনি রবীন্দ্রনাথের অখ্যাতির পেছনে যে সত্য তা উদ্‌ঘাটন করতে অনলস পরিশ্রম করেছেন, যার ফসলই হল এই বইটি। এই বইয়ের গরিষ্ঠ অংশই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি এবং তৎপরবর্তী ইউরোপ জনমানসে প্রতিক্রিয়া বিষয়ে। বিশেষত, যেখানে তাকে কালিমালিপ্ত করার প্রচেষ্টা হয়েছে বারংবার --- “দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টায় রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পুরো প্রেক্ষিতটিকেই নতুনভাবে আবিষ্কার করে এ-গ্রন্থে তুলে ধরেছেন।” এর সাথে রয়েছে রোম্যাঁ রোলাঁ ও পশ্চিমের চোখে রবীন্দ্রনাথ। পড়তে গেলেই বোঝা যায় কি পরিমাণ খুঁটিয়ে রিসার্চটি উনি করেছেন, এবং তার ফলস্বরূপ এই...

ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে...

Image
অক্টোবর ১ : গতকাল, ৩০শে সেপ্টেম্বর ১৮৭৬, সকাল এগারোটার কয়েক মিনিট বাদে মস্কো থেকে আগত মারিয়া বরিসভা নামে এক দরজি বিশ নম্বর গালেরনায়া স্ট্রীটের ছয়তলা উঁচু অভ্‌সিয়ান্নিকভ হাউসের চিলেকোঠার জানলা থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। ... আত্মহত্যার সময়ে বরিসভার দু-হাতে মেরি-মাতার আইকন ধরা ছিল। (জনৈক সংবাদপত্রে প্রকাশিত কলামের অংশবিশেষ)             দস্তয়েভস্কির মতে, এটি ‘বিনীত, বিনম্র আত্মহননের এক অভূতপূর্ব নিদর্শন’। তিনি লিখছেন, “এখানে দেখাই যাচ্ছে, কোনও কাতরোক্তি বা কারও বিরুদ্ধে কোনও অনুযোগ --- এসবের কিছু নেই। স্রেফ বেঁচে থাকাটাই তার পক্ষে দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। ‘ঈশ্বর তা চানও নি’ --- তাই সে মারা গেল, প্রার্থনা করতে করতেই মারা গেল। কিন্তু কিছু ব্যাপার আছে যেগুলি দেখতে যত সাধারণ-ই হোক-না-কেন, তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চিন্তা না করে পারা যায় না। সেগুলি আপনার চোখের সামনে এমনভবে দাঁড়িয়ে থাকবে যেন আপনি নিজেও তার জন্যে দায়ী। এই বিনম্র মেয়েটি যে নিজেকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিল এটা কিন্তু আপনি চান-না-চান আপনার মনকে পীড়া দেবেই দেবে।” দস্তয়েভস্কি লিখছেন, তা...

চীনা সংসারের একটুকরো রোজনামচা

Image
লিউ ঝেনউয়ুন চীনদেশের হেনান প্রদেশের মানুষ। ২০১১ সালে পেয়েছেন ‘ মাও দুন ’ সাহিত্য পুরস্কার, যা চীনা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের সমতুল্য ধরা হয়। আচ্ছা, আমাদের দেশের কোন পুরস্কারটা ভারতীয় সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার হিসাবে ধরা হয়? সাহিত্য অকাদেমী? জ্ঞানপীঠ? জানি না। তো যাই হোক, বাঙলা ভাষায় এই প্রথম তার বই অনুবাদ করা হয়েছে। করেছেন আশিস দেব। চমৎকার অনুবাদ। কিছু কিছু শব্দ, এমনকি বাক্যবন্ধকেও বাংলা তর্জমা করেছেন, এমনকি কাঁচা খিস্তিও। অহোঃ! চমৎকার সাহসী অনুবাদ।       শিয়াও লিন্‌, স্বামী, রোজ সকালে উঠে পনীর কেনার লাইনে দাঁড়ায়। বাড়ি ফেরে। ঘরে আয়া, খানিক ফাঁকিবাজ, খানিক বা কাজের। শিয়াও লিন্‌ তাকে বকাবকি করে। শিয়াও লি, স্ত্রী, ঘরের আয়াকে বকাবকি করে কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য। তারপর স্বামীকে বকাবকি করে। অতঃপর দুজনে ঝগড়া করে। এই পর্যায়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ খানিকটা হয়ে যায়। তারপর দুজনেই অফিসে চলে যায়। ঘরে রয়ে যায় আয়া এবং তাদের ছোট্ট বাচ্চা। তারা রোজ অফিসে যায় । প্রতিবেশী ভারতীয় পরিবারটি দুই চক্ষের বিষ, যদিও, দুজনেরই দুজনকে প্রয়োজন। তারা জলের চুরি করে। ধরা পড়ে। লজ্জা পায়। আবার চুরি করে...