দেয়ালে একটি জানলা

 


 

এতদিন চুপ করেছিলাম, বইমেলার কারণে। বইমেলার বই, আনন্দ, টুকরো টুকরো তথ্যের ভিড়ে বইয়ের লিস্ট তৈরি করে নেওয়া, দেখে নেওয়া। এর মাঝে নতুন করে কোনো বই পড়তে ইচ্ছেও করে না। চুপ করে বসে থেকে কেবল ফেসবুকের টাইমলাইন উল্টে-পাল্টে দেখে নিতে নিতে অলস সময় যাপন।

সম্প্রতি আরেকটি বই জোগাড় করার পরে আবার ফিরে এলাম। লেখকের নাম বিনোদকুমার শুক্ল। এই লেখক-কবি আমাকে টেনে এনেছেন হিন্দি সাহিত্যের অন্দরে, হিন্দি ভাষার যাদুতে। তাঁর একটা কবিতার বইয়ের কথা আগেই লিখেছি। আজ লিখব একটা উপন্যাসের ব্যাপারে, যেটা পড়তে শুরু করেছি।

এটা রিভিউ নয়। এটা একটা আদান-প্রদান, আপনাদের সঙ্গে। বিনোদকুমার শুক্লের এই বইটার নাম — দেয়ালে একটি জানালা। ‘দিওয়ার মে এক খিড়কি রহতি থি’-এর বঙ্গানুবাদ হয়েছে ২০০৮ সালে। এখনও প্রথম সংস্করণ শেষ হয়নি। কেউ জানত কি এর অনুবাদ করা হয়েছে সাহিত্য আকাদেমি থেকে? এই বইমেলায় এই বইটা নাকি এমন বিক্রি হচ্ছে যে, গোডাউন থেকে বইমেলার মাঝেই বইয়ের এক্সট্রা কপি এনে রাখতে হচ্ছে!

“মিতায়তন এই উপন্যাসের কেন্দ্র জুড়ে আছে রঘুবর প্রসাদ আর তাঁর নবপরিণীতা সোনসি। একটি কলেজের অঙ্কের শিক্ষক সব্যসাচী রঘুবর। থাকে একঘরের বাসাবাড়িতে। দেয়ালের জানালা থেকে লাফ দিয়ে রঘুবর-সোনসি নদী-পুকুর-চাতাল-তোতা-বাদর-নীলকণ্ঠ-গাছ-পাহাড়ের সংগীতধর্মী স্বপ্নিল সংসারে প্রবেশ করে। সেখানে আর কারও প্রবেশাধিকার নেই।

মহান ঘটনা, বিরাট সংঘর্ষ, যুগসত্য-রহিত এই উপন্যাসে বিনোদকুমার জীবনের গভীরে প্রবেশ করে সংগ্রহ করেছেন এক আনন্দময় বিস্ময়। প্রদর্শনবাদিতাকে অস্বীকার করে তিনি তুলে ধরেছেন স্ত্রী-পুরুষের অনুত্তেজক ইন্দ্রিয়পরায়ণতা। তাঁর সৃষ্ট ঘটনা আর চরিত্রদের ভেতর দিয়ে আমরা নিজেদের সঙ্গে পরিবার-পরিচিতদের, চারপাশকে বারবার দেখি আর চিনি আর কাঁদি আর হাসি আর ভাবতে থাকি — কী গভীর দৃষ্টিবোধ আর অনুভূতির অধিকারী বিনোদকুমার।”

বইয়ের পেছনে উপন্যাস সম্পর্কে লেখা। দু-তিন পাতা পড়েছি। আমাকে এখনও খুব একটা অভিভূত করেনি। করতে পারেনি। মহান বই বলে? না কি অ-মহান বই বলে? উপন্যাস শেষ হলে তা বোঝা যাবে। যদিও তাঁর কাব্যগ্রন্থ আমাকে অভিভূত করেছে।

উপন্যাসের শুরুতে একটি কবিতা আছে। দিলাম। বঙ্গানুবাদটি সক্ষম না অক্ষম — সেটা আপনাদের বিবেচনা —

অগুন্তি থেকে বেরোনো একটি তারা ছিল।

একটি তারা অগুন্তি থেকে বাইরে বেরিয়েছিল কী করে?

অগুন্তি থেকে আলাদা হয়ে একাকী একটি কিছুক্ষণ ছিল প্রথম।

হাওয়ার ঝাপটা যা এসেছিল তাও ছিল অগুন্তি হাওয়ার ঝাপটার প্রথম ঝাপটা কিছুক্ষণ।

অগুন্তি থেকে বেরোনো একটি ঢেউও প্রথম কয়েক মুহূর্ত মাত্র।

অগুন্তির একলা অগুন্তি একাকী অগুন্তি।

অগুন্তি থেকে একাকী একজন সঙ্গিণী সারা জীবনের।

 

 

"অনেক ফুলের গন্ধের পরে এক শেষ ফুলের সুগন্ধ মার কাছে থেকে গিয়েছিল। ওই ফুলের গন্ধটার মার কাছ থেকে চলে-যাওয়ার কথা মনে ছিল না।" 

ঋতু পরিবর্তন প্রতিবারই আমায় ঝাপট দিয়ে চলে যায়, এবারও তার অন্যথা হয় নি। আমায় সাতদিন শয্যাশায়ী দুই দিন ক্রমাগত টয়লেটগামী করে গিয়েছে। মাথা যন্ত্রণায় যখন চোখ খোলা দায়, তখন কোকিল কখন তার কুহুতান শুরু করেছে, টের পাই নি। আমার আশেপাশে তখন কেউ ছিল না। মাথার কাছে ছিল হেলাল হাফিজ আর বিনোদকুমার শুক্ল। 

আমি মাঝে মাঝে বইটা খুলে পড়তাম। একটু একটু করে। আমার রোগশয্যায় তিনজন কেবল ঘোরাফেরা করে --- রঘুবর প্রসাদ, সোনসি আর একটা হাতি। 

উপন্যাসের নাম - দিওয়ার মে এক খিড়কি রহতি থি - দেয়ালে একটি জানলা। 

উপন্যাসটা ছবির মতো, কবিতার মতো। মায়াভরা যাদু বাস্তবতায় ভরা এক দম্পতির জীবন আটপৌরে। তাদের নববিবাহের পরের খবর কতজনের চোখে ধরা পড়ে? সে বিয়ের আগে কোন প্রিম্যারেজ ফটোশ্যুট ছিল না। বিয়ের পরে ছিল না কোন রোমান্টিক স্থানে গিয়ে মধুচন্দ্রিমার উত্তেজনা। কেবল ছিল একটেরে একটা ঘরে একটা খাটিয়া, আর একটা জানলা। 

জানলার ওপাশের পৃথিবী কেমন, রঘুবর প্রসাদ??? সোনসি, তুমি কি বলতে পারো??? 

"দুজনে জেগেছিল। আর সব কিছু ঘুমে ঝিমোচ্ছিল। পুকুর ঘুমের মধ্যেও পুকুরই ছিল। আকাশ ছিল ঘুমের আকাশ।" 

আর এই পুকুরে ছিল পদ্মফুল। পুকুরের ধারে এক বুড়ি থাকত। চা খাওয়াতো তাদের। আকাশে ছিল পূর্ণচন্দ্র, আকাশে ছিল অমাবস্যা। রাতের পাখী দিনের আঙ্গিনায় বার্তা দিয়ে যেত, তোমাদের ভালো হোক। দিনের পাখীর পালকে লেখা থাকত, তোমরা দুজন ভাল থাকো। 

গরীব, অথচ স্বচ্ছল এক পরিবার। রঘুবর প্রসাদ শিক্ষক। তার স্ত্রী সোনসি। মফস্বলে থাকে একটা মাত্র ঘর ভাড়া নিয়ে। সেই ঘরে আসে রঘুবর প্রসাদের বাবা, মা, ভাই। যখন তারা আসে, ঘরে তখন জোছনার দুধসায়র। তারা জানলা গলে চলে যায়। সেই সায়রে ভাসে, হাসে, কাঁদে। দারিদ্রতা পিছু ছাড়ে না। কিন্তু দারিদ্রতার সাথে সাথে দুঃখ ঠাই পায় না। 

দুঃখ কি আসে না? আসে বৈ কি। রঘুবর প্রসাদের দুঃখ হয়। সোনসি যখন চলে যায়। বাপের বাড়ি। একাকী ঘরে জানলা সাক্ষী থাকে। কোন সাক্ষ্যের জবানবন্দি লেখা হয় তার খাতায়? 

"রাতে রঘুবর প্রসাদের ঘুম ভাঙল। কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে থেকে তারপর উঠল। দরজা খুলে বাইরে এল। রাস্তার ধারে নিমগাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকল। রাস্তার বাতির আলো তার কাছে পৌঁছোচ্ছিল না। ওর ইচ্ছা হল রাতের নিস্তব্ধতায় বলে, 'নেই।' এসময় নিজের ঘরের বাইরে দূরে ওই লোকটাও বসে থাকবে, যে প্রথমে রঘুবর প্রসাদের 'নেই' শুনেছিল। তখন ও বলেছিল 'কে নেই ভাই?' রাতের বাতাবরণ ওরকমই ছিল। ডুমুর গাছ থেকে একটা পাখি আবার এমনিই উড়েছিল। এবার রঘুবর প্রসাদকে দেখে উড়ে গেছে। গাছের উপর ছেলেটা থাকবে না। নেই-এর মতো বাতাবরণ ছেয়ে গিয়েছিল। ঘরের সামনে বসে থাকা লোকটির দূর থেকে মনে হবে যে দূরে দরজা খুলে কেউ বাইরে এসেছে। ও থাকতে পারল না। ও ভাবল জিজ্ঞেস করে 'কে নেই?' ও জোরে বলেছে হয়তো। 'কে নেই?' রঘুবর প্রসাদ হয়তো শুনেছে। জবাবে ওর মুখ থেকে বেরোল 'সোনসি নেই।' কাতর মন থেকে বেরোল যে সোনসি নেই। যেই হোক না কেন সে শুনেছে। ওই লোকটা ঠাণ্ডা নিশ্বাস নিয়ে মাথা হেলিয়ে কিছুক্ষণ বসে ছিল হয়তো। সন্তুষ্ট হল যে, ওর উত্তর পেয়ে গেছে। ও ঘরের ভিতর চলে গেছে হয়তো। ওই রাতে ওর ঘুম আসেনি হয়তো। ও জানতে চাইছিল যে কে নেই। এবার জেনে গেছে। ও সোনসিকে জানত না। যাইহোক তা সত্ত্বেও এবার রাতে ঘুমোতে পারবে।" 

ভালোবাসা কি কাছে থেকেই টের পাওয়া যায় সোনসি? দূরে গেলে তার ম্রিয়মান দেহবল্লরী চোখে পড়ে না তোমার? তাই কি তুমি ফিরে আসো। তাই কি চিঠি লেখ আকাশে? সে চিঠি পড়ে রঘুবর, আকাশের ভূর্জপত্রে! আপন মনে। 

হাতি চড়ে কারা? যারা রাজার ব্যাটা। রঘুবর প্রসাদ তার ওই একটিমাত্র ভাড়ার ঘরের রাজার ব্যাটা। তাকে কাজের যায়গায় দিতে-নিতে আসে হাতী। মাহুত হল সাধু। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সোনসি দেখে রাজা চলেছে রাজসভায়। সেখানে সে দুহাত দিয়ে বোর্ডে অঙ্ক করে। বোঝা যায় না, কোনটা বাহাতে লেখা আর কোনটা ডানহাতে লেখা। 

সাধু চলে যায়। হাতি রয়ে যায়। হাতিও চলে যায়। রঘুবর প্রসাদ রয়ে যায়। আর রয়ে যায় সোনসি... 

"সাধু তাহলে হাতি নিয়ে গেছে। চা খেতে এল না। বলেও গেল না। মনে হয়, সাধু একদম হঠাৎ করে যাবে না। ধীরে ধীরে হঠাৎ করে যাবে। প্রথমে আধঘণ্টার জন্য। তারপর চার ঘণ্টার জন্য। দশ দিনের জন্য, তারপর দশ/ কুড়ি বছরের জন্য। কুড়ি বছর পর জীবনের কতটুকু বেঁচে থাকবে। আজীবন চলে যাবে। যে আজীবন চলে যায়, কোনো খোঁজ খবর না থাকে, মৃত্যুর খবর নেই, তাহলে নিজের চলে যাওয়ায় সে হামেশা বেঁচে থাকে। বংশপরম্পরায়-এর জন্য বিস্মৃত না-হয়ে গেলে তার ফিরে আসার আশা বংশপরম্পরা ধরে থাকে। যখনই এটা জানা যায় যে সে মরে গেছে তখনই তার ফিরে আসার অনন্ত কালের প্রতীক্ষা শেষ হয়ে যায়।" 

এ উপন্যাসের মাধুর্য একবারে চেটেপুটে খেয়ে ফেলার মতো নয়। ধীরে ধীরে শীতের রোদে পিঠ দিয়ে কুলের আচার খাওয়ার মতো করে খেতে হয়। জ্বর, অনেক ধন্যবাদ তোমায়... 

এ উপন্যাস হয় ভালো লাগবে। না হলে লাগবে না। বিনোদকুমার শুক্ল আর কোন পথ খোলা রাখেন নি। 

আর হ্যাঁ। পড়তে হলে হিন্দীতে পড়া ভালো। বাংলা অনুবাদ অখাদ্য না হলেও এমন কাব্যিক মহিমার সুবিচার করতে পারেন নি সুস্মিতা দত্ত।

 

==========

 

দেয়ালে একটি জানলা

বিনোদকুমার শুক্ল

সাহিত্য আকাদেমি

মুদ্রিত মূল্যঃ ৯০/-

Comments

Popular posts from this blog

যে বুকে আগুন জ্বলে

শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা সম্পর্কে

জেরক্স কপির উন্নত ভার্সানে ‘আবার প্রলয়’ এসেছে