সাদা বই হান কাং

 


“For God’s sake don’t die, she muttered in a thin voice, over and over like a mantra. After an hour had passed, the baby’s tight-sealed eyelids abruptly unseamed. As my mother’s eyes met those of her child, her lips twitched again. For God’s sake don’t die. Around an hour later, the baby was dead. They lay there on the kitchen floor, my mother on her side with the dead baby clutched to her chest, feeling the cold gradually enter into the flesh, sinking through to the bone. No more crying.” [Newborn Gown]

      হান কাং আমায় সত্যিই বিস্মিত করছে। যত তার রচনা-অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আমি যাচ্ছি, আমার মনে হচ্ছে, এ অনন্ত মহাবিশ্বে কোটি কোটি কালো হতাশার মধ্যে যে আলোক বর্তিকা জীবনের অর্থ বহন করে চলেছে, তার এক সত্যরূপ প্রতি পৃষ্ঠার, বলা ভালো প্রতি লাইনের পরতে পরতে তিনি বয়ে নিয়ে চলেছেন। এ এক সত্যরূপ। আলো ও অন্ধকার একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একেই বলে ‘হাং’।

      “ভগবানের দোহাই, মরে যাস না।”

      হান কাং-এর ‘সাদা বই’ (The White Book) আত্মজীবনীমূলক কাব্য-আখ্যান। শৌভিক দে সরকারের অনবদ্য কাব্যিক অনুবাদে এই বইয়ের বঙ্গীয় সংস্করণের সার্থকতা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। সাদা বইয়ের এই আখ্যান তার মৃত দিদির জন্য। যে বেঁচেছিল মাত্র কয়েক মিনিট। কিন্তু সেই মেয়েটি তার মায়ের বুকের মধ্যে বেঁচেছিল – চিরজীবন। আর, ঠিক এইখান থেকেই হান কাং-এর তার মৃত অতীত ধূলিধূসরিত দিদিটির কাছে যাওয়ার প্রয়াস, তাকে ছোঁয়ার প্রয়াস। তাকে নিজের আয়নার আলো-আধারিতে দেখার প্রয়াস। গদ্যীয় কাব্যের দ্যোতনায়।

      কেন?

      “আমি শুধু ভাবতাম যে আমার যদি একজন দিদি থাকত তাহলে কেমন হত! আমার থেকে এক হাত লম্বা একজন অগ্নি। একজন অগ্নি, যে আমাকে নিজের অল্পস্বল্প ববলিন ওঠা সোয়েটার, সামান্য আঁচড়ের দাগ লাগা পেটেন্ট চামড়ার জুতো দিয়ে দিত। ... একজন অগ্নি, যদি আমি অন্ধকারে থম মেরে বসে থাকতাম, তখন আমার কাছে এগিয়ে আসত। এটার কোনো দরকার নেই। এটা শুধু একটা ভুল বোঝাবুঝি। তারপর ঝপ করে একটু জড়িয়ে ধরা। ওঠ, উঠে পড়। তোর ভালোর জন্যই বলছি। খাবি চল। আমার মুখের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া ঠান্ডা একটা হাত। খুব দ্রুত দূরে সরে যাওয়া ওর দুটো কাঁধ।” (তোমার চোখ)

      এই চাওয়ার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে, সকল চাওয়ার আসল চাওয়া। এক অজানা অচেনা শহরে, যেখানে ভাষা পর্যন্ত তার অজ্ঞাত, সেখানে সে হয়ে ওঠে একদমই একা। সত্যিকারের একা। সকলের মাঝে একা। আর এই একাকীত্বের মধ্যে যতরকম ‘সাদা’ আছে তার মধ্যে থেকে এই মৃত অতীতের দিকে হাতড়ে হাতড়ে এগিয়ে যেতে যেতে জীবনের পরতে পরতে সে একটু একটু করে খুঁজে পায় সত্যের টুকরো টুকরো রূপে --- মায়াময় দর্শনের কাব্যিক ভঙ্গিমায়।

      “গরমকালের শেষদিকে একটা বিকেলবেলায় নির্জন একটা ভাড়াবাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে এটা দেখেছিল ও। তেতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একজন মহিলা কাচা জামাকাপড়গুলো রেলিঙের ওপর মেলে দিচ্ছিল আর মেলতে গিয়ে কয়েকটা জামাকাপড় মুঠো থেকে খসে গিয়ে নীচে এসে পড়ল। একদম একা একটা রুমাল সবার শেষে ভাসতে ভাসতে মাটিতে নেমে এল। অনেকটা অর্ধেক ডানা মুড়ে রাখা একটা পাখির মতো, যে মতামত জানার জন্য অবতরণের জায়গাটাকে পরীক্ষাচ্ছলে প্রশ্ন করছে।” (রুমাল)

      সাদা মানে শূন্যতা, আবার জন্মেরও প্রতীক। Han Kang সাদা রঙের ভেতর খুঁজে নেন শোক (mourning), পবিত্রতা (purity), নীরবতা (silence) । ফলে সাদা এখানে একেবারে দ্বৈত একসাথে জীবন আর মৃত্যু, শুরু আর শেষ, শূন্যতা আর পূর্ণতা। বইটা Han Kang-এর অজাত ছোট বোনকে কেন্দ্র করেযে জন্মেই মারা যায়। এই অদৃশ্যতাই পুরো লেখার চালিকাশক্তি।What does it mean to grieve someone who never really lived?” — এই প্রশ্ন বারবার উঁকি দেয়। তাই বইটা “যা নেই সেই শূন্যতার জন্য শোক করার একটা টেক্সট।

      “আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই জীবন যাকে একতরফা শুভেচ্ছা জানাতে থাকবে। এই উপলব্ধিটা ভেতরে নিয়েই ও রাস্তা দিয়ে হাঁটছে আর অনবরত বরফের গুঁড়ো গায়ের ওপর এসে পড়ছে। ভুরু, গাল ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু সরে সরে যায়। ওই স্মৃতিটাই শুধু ওর মনে থেকে যায়-ওই উপলব্ধিটা যে যা-কিছু ও আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে সবই ওর থেকে দূরে সরে গিয়েছে, উধাও হয়ে গিয়েছে -এই রাস্তাগুলোর মধ্যে বরফবৃষ্টি ঝরছে, যেগুলো বৃষ্টি না, তুষার না, বরফ, জল কোনোটাই না, ও একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকুক কি জোরে জোরে হাঁটুক, চোখ বন্ধ করুক কি খুলে রাখুক, ওর ভুরুদুটো ভিজিয়ে স্যাঁতসেঁতে করে দিয়ে ওর কপাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে।” (ঢেউ)

The White Book একেবারে ভেতরের নীরবতা নিয়ে নাড়াচাড়া করে। পড়ার সময় মনে হবে আমি যেন একা বসে ধ্যান করছি কোন এক অনুভূতির, এক চিরন্তনী অনুভূতির মনে হবে খুব কম শব্দ, কিন্তু শব্দের ফাঁকে অনেক কিছু বলা হচ্ছে। এটাকে ‘নভেল’ হিসেবে নয়, বরং একটা শোকপ্রার্থনা বা সাদা ক্যানভাসে আঁকা ধ্যানচিত্র হিসেবে যদি চিত্রায়িত করা যায়, তাহলে সেই নীরব অভিযোজিত ভাব যে বেদনার মধ্যে দিয়ে আমার বুকের মধ্যে এসে মিলিয়ে যাবে, সেই-ই সত্য এবং সেই সত্যের কোন রূপ নেই, ব্যখ্যা নেই, অথচ আছে। নিজের জীবনের শোক আর শূন্যতার সাথেও মিলিয়ে দেখলে সেই রূপের পরিকাঠামো আরও জাজ্বল্যমান হবে অন্তরেরও অন্তরে…

সেই অন্তরের সত্য কি? এক একজনের এক একরকম। লেখিকার ক্ষেত্রে? এমন এক মর্মান্তিক সত্যি লেখিকা তুলে ধরছেন তার সত্যটাকে যে ব্যাথায় বুকের ভেতরটা নিংড়ে যায়। তার দিদির এই অকালে চলে যাওয়াই তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারন। তাহলে? কোনটা সত্যি? সে অকাল বোধনে এসেছে, সে জানে, পৃথিবীতে তার জন্যে কেউ অপেক্ষা করছিল না। তার বাবা নয়, তার মা নয়… সে অনাহুতা।

“প্রথম সন্তান মারা যাওয়ার একবছর পর মায়ের আর একটা অকাল প্রসব হয়েছিল।

আমাকে বলা হতো যে এই সন্তানটা একটা ছেলে ছিল। আগের মেয়েটার থেকে আরও কম সময় গর্ভে ছিল আর জন্মের পর পরই মারা গিয়েছিল, একবারও চোখ খোলেনি। ওই প্রাণদুটো যদি সংকটের মুহূর্তগুলো নিরাপদে কাটিয়ে উঠতে পারত, তাহলে হয়ত তিন বছর পর আমার নিজের জন্ম এবং আরও চার বছর পর আমার ভাইয়ের জন্মই হত না। আমার মাকে হয়তো নিজের ভেতরের ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে নিয়ে, ওদের ধারালো কোনাগুলোর ওপর সাবধানে আঙুল বোলাতে বোলাতে বেঁচে থাকতে হত না।

এই জীবনের আমাদের দুজনের মধ্যে শুধু একজনকেই প্রয়োজন ছিল। যদি তুমি ওই প্রথম কয়েকটা ঘণ্টা পার করে বেঁচে থাকতে পারতে তাহলে, তাহলে আমি এখন আর বেঁচে থাকতে পারতাম না।

আর আমার বেঁচে থাকার অর্থ হল তোমারটা অসম্ভব।

শুধুমাত্র আলো আর অন্ধকারের এই ফাঁকটুকুতে, শুধু মাত্র এই নীলচে রঙের ফাটলে আমরা একে অন্যের মুখদুটো চিনে উঠতে পারি।” (সমস্ত সাদা)

তাহলে? এক অকল্পনীয় সত্যের সান্ত্বনা কোথায়? যখন আমি জানি যে, আমি জন্ম থেকেই অনাহুতা, আমি জানি যে, আমি যার পেট থেকে বেরিয়েছি, যার কোলে কোলে বড়ো হয়েছি, তারা মনে মনে আমাকে কামনা করে নি, তারা আমাকে বাধ্যত এক শোকাচ্ছন্নতায় গ্রহণ করেছিলেন, যার প্রতিধ্বনি জ্ঞানে-অজ্ঞানে বহুবার আমার কাছে ফিরে আসছে। তখন কোন দর্শনে আমি বেঁচে থাকি?

“মরে যাস না। ভগবানের দোহাই, মরে যাস না।

আমি আমার ঠোঁটদুটো ফাঁক করে বিড়বিড় করে শব্দগুলো উচ্চারণ করলাম যেগুলো তুমি তোমার কালো চোখদুটো খোলার পর শুনতে পেয়েছিলে, কোনো ভাষাই জানা ছিল না তোমার। আমি সাদা কাগজের ওপর শরীরের সবটুকু শক্তি নিয়ে ঝুঁকে পড়লাম। আমি বিশ্বাস করি বিদায় জানানোর জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো শব্দ খুঁজে পাওয়া যাবে না। মরে যেয়ো না। বেঁচে থাকো।” (বিদায়)

 

===================

 

সাদা বই

হান কাং

অনুবাদকঃ শৌভিক দে সরকার

অভিযান পাবলিশার্স

মুদ্রিত মুল্যঃ ২৫০/-

Comments

Popular posts from this blog

যে বুকে আগুন জ্বলে

শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা সম্পর্কে

জেরক্স কপির উন্নত ভার্সানে ‘আবার প্রলয়’ এসেছে