ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট
বেশ
কয়েক বছর পরে ফিরে এলাম দস্তয়েভস্কির এই উপন্যাসের কাছে। মনে আছে, প্রথমবার যখন পড়েছিলাম,
তখন ইম্পর্ট্যান্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘটনার গতিপ্রকৃতি। আমার কম বয়সের জন্য? কম ম্যাচিউরিটির
জন্য? অথবা কাল্ট সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যই এই—প্রতিবার পাঠকের কাছে নতুন করে ধরা দেয়।
দস্তয়েভস্কি
এই কথাগুলো লিখছেন উপন্যাসের প্রায় শুরুতেই—সোনিয়ার বাবা মার্মেলাদভের সঙ্গে কথোপকথন
শেষে, তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে। আর এই কথাগুলো তিনি ডিক্টেট করছেন ১৮৬৬
সালে; ডিক্টেশন নিচ্ছেন আন্না স্নিতকিনা, যিনি কিছুদিনের মধ্যেই তার ঘরণী হবেন।
ঠিক
সেই সময়ে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির চাকর-মহলে মানুষ হচ্ছেন আর-একজন কিংবদন্তি। তখন তার
জীবনের সূচনালগ্ন। আরও প্রায় পচাত্তর বছর পার হবে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি লিখবেন
তার শেষ প্রবন্ধ। সেই প্রবন্ধ পড়ার ক্ষমতা তার থাকবে না; তার উপস্থিতিতে সেটা পড়বেন
ক্ষিতিমোহন সেন। সেই প্রবন্ধের একেবারে শেষে এসে তিনি লিখবেন—
“আজ
পারের দিকে যাত্রা করেছি—পিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, কী রেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর
উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ! কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ—সে
বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে
ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে।
আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার
মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন, প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস
করাকে আমি অপমান মনে করি।”
প্রবন্ধের
নাম তিনি দিচ্ছেন—সভ্যতার সংকট।
Existential
doubt আর existential faith—কোথাও যেন এক বিন্দুতে, এক সিদ্ধান্তেই এসে মিলে যাচ্ছে।
দস্তয়েভস্কি সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছেন সন্দেহের মধ্য দিয়ে, আর রবীন্দ্রনাথ পৌঁছাচ্ছেন
বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দুজনেই কোথাও একই সিদ্ধান্তে আসছেন: মানুষকে হেয় করে দেখাটাই
আসলে ভুল। মানুষ ভিতরে দানব নয়—মানুষের সম্ভাবনা বিশাল। এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাস
হারালে সব ভেঙে পড়ে।
২
১৮৪০-এর দশকের রাশিয়া — জার নিকোলাস
I; কঠোর শাসন; ফলে ছাত্র-যুবকদের মধ্যে কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রুপ তৈরি হয়েছিল যারা
‘উদারবাদ’, ‘সমাজ-সংস্কার’, ‘স্বাধীনতা’, এসব নিয়ে
আলোচনা করত। সেই গ্রুপগুলোর মধ্যে একটি ছিল পেত্রাশেভস্কি সার্কেল।
কি ছিল এই সার্কেলের মূল অ্যাজেন্ডা?
১। ক্রীতদাসত্বের উচ্ছেদ;
২। রাজনৈতিক আমূল সংস্কার;
৩। ইউটোপিয়ান সমাজতন্ত্র নিয়ে পর্যালোচনা;
৪। বেলিনস্কির লেখা নিষিদ্ধ চিঠিপত্র
পড়া — এগুলো সেই সময়ে ছিল জারের চোখে অপরাধ — ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ টাইপ ব্যাপার স্যাপার আর কি।
ফলে ১৮৪৯ সালে, রাশিয়ান সিক্রেট পুলিশ
দস্তয়েভস্কি-সহ পুরো গ্রুপকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ করা হয় তিনটে ব্যাপারে — রাষ্ট্রবিরোধী
কার্যকলাপ + বিপ্লবী চিন্তা ছড়ানো + নিষিদ্ধ সাহিত্য প্রচার।
এতে মৃত্যুদণ্ড ধার্য হয়।
এবার সরাসরি সেই মুহূর্তের কথা আসা
যাক — মৃত্যুমুহূর্ত। দস্তয়েভস্কি ও অন্যদের চোখ বাঁধা হল; ফায়ারিং স্কোয়াড প্রস্তুত;
সৈনিকের বন্দুক তাক করল; তারা শেষ মুহূর্তের জন্য প্রার্থনা করছে… ঠিক এই সময়ে… ঘোড়ায় চড়ে
এক অফিসার দৌড়ে এসে ঘোষণা করে — জারের পক্ষ থেকে বিশেষ ক্ষমা — মৃত্যুদণ্ড স্থগিত।
কেন? আসলেই এটা ছিল অত্যাচারের এক
অদ্ভুত কৌশল। এটা ছিল ‘মক এক্সিকিউশন’। কিন্তু
এটা সম্ভবত দস্তয়েভস্কি-সমেত সমস্ত মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত মানুষের জীবন আমূল বদলে
দিয়েছিল।
এই শেষ মুহূর্তের অনুভূতির কথা তার
অনেক উপন্যাসে পাওয়া যায়। বিশেষ করে দ্য ইডিয়ট উপন্যাসে এর একটা সুবৃহৎ পর্ব আছে।
Notes from a Dead House–এর কথা বাদ দিলেও আমি খুঁজে পাচ্ছি ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট
উপন্যাসেও এই মরণাতঙ্কের অনুভূতির ছাপ, সুস্পষ্টভাবে।
রাসকলনিকভ মার্মেলাদভের ফ্ল্যাট থেকে
নামছে ধীরে ধীরে। মৃত মার্মেলাদভের স্ত্রীকে তার শেষ কপর্দকখানি দিয়ে সে সর্বস্বান্ত।
হত্যার ফলে সে যে টাকা ও গয়না হাতিয়েছে তা সে ছুঁতে পারবে না। ঘটনার অভিঘাতে সে বিপর্যস্ত।
কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় তার যা উপলব্ধি তা এককথায় — মরমী।
“সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল ধীরে-ধীরে, কোন তাড়াহুড়ো না করে। জ্বরের
প্রকোপে তার সর্বাঙ্গ কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু সেদিকে তার কোন হুঁশ নেই। তখন
সে পরিপূর্ণ, বিপুল জীবনের আকস্মিক প্রবল উচ্ছ্বাসে, এক নতুন ধরনের অবাধ উপলব্ধিতে
আপ্লুত। মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত কোন আসামিকে যখন অকস্মাৎ, অপ্রত্যাশিতভাবে জানান হয়
যে তাকে ক্ষমা করে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তখন তার যে উপলব্ধি হয় এই উপলব্ধির সঙ্গে তার তুলনা
চলতে পারে। সিঁড়ির অর্ধেক পথ যেতে দেখতে পেল পুরোহিতও তার পেছন-পেছন আসছেন — ফিরে চলেছেন।
রাসকলনিকভ বিনা বাক্যব্যয়ে সরে গিয়ে তাঁকে পথ করে দিল, নীরবে মাথা নেড়ে দুজনে নমস্কার
বিনিময় করল। কিন্তু শেষ ধাপে পা ফেলার সঙ্গে-সঙ্গে রাসকলনিকভ কার যেন দ্রুত পদশব্দ
শুনতে পেল। মনে হল কেউ তার পিছন-পিছন ছুটে আসছে। আসছিল পোলেন্কা। পিছন-পিছন ছুটতে-ছুটতে
সে ডাকছিল তাকে: ‘শুনুন! একটু শুনে যান।’”
উপন্যাসের গতিপ্রকৃতি ধরে এগোলে পাওয়া
যায় আরও একটা অনুভূতির আবহ —
“রাসকলনিকভ চলতে-চলতে মনে-মনে ভাবল, ‘কোথায়, মনে পড়ছে না, কোথায়
যেন পড়েছি, একজন ফাঁসির আসামি মৃত্যুর এক ঘণ্টা আগে বলছে, অথবা হতে পারে ভাবছে, তাকে
যদি অনেক উঁচুতে, খাড়া পাহাড়ের কোন শিলাখণ্ডের ওপর এমন একটা চিলতে জায়গায় থাকতে দেওয়া
হয় যেখানে কোনরকমে দুটো পা রাখা যায় মাত্র, যার চারধারে শুধুই অতল গহ্বর, মহাসাগর,
অনন্ত আঁধার, চিরনিঃসঙ্গতা, নিরন্তর ঝড়ঝঞ্ঝা — সেখানে যদি হাতখানেক জমির ওপর সারা জীবন,
হাজার বছর, অনন্তকাল একপায়ে খাড়া হয়ে থাকতে হয় — তাও সই — এখন মরার চেয়ে ওভাবে জীবন
কাটানোও ভালো! বাঁচতে হবে, বাঁচতে হবে, বাঁচতেই হবে! কী ভাবে সেটা বড় কথা নয় — আসল
কথা, বাঁচতে হবে। ... কত বড় সত্যি এটা! ওঃ ভগবান, কত বড় সত্যি! মানুষ কত ইতর! আবার
এর জন্য যে তাকে ইতর বলে সে নিজেও ইতর,’ কয়েক মুহূর্ত পরে সে যোগ করল।”
কি সাংঘাতিক, তাই না? দস্তয়েভস্কি
নিজে লিখেছিলেন, “মৃত্যুদণ্ডের মুহূর্তে মানুষের সময়বোধ বদলে যায়; কয়েক সেকেন্ডও অনন্ত
হয়ে ওঠে।” আর সেই অনন্ত থেকেই বোধ হয় সৃষ্টি
হয় তার অমর উপন্যাসগুলো।


Comments
Post a Comment