কোরে কাগজ

 


“অমৃতা প্রীতমের উপন্যাসের মূল তত্ত্ব হলো মানবিক অনুষঙ্গ। নারী-পুরুষের সম্পর্কের জটিলতা এবং সেই জটিলতার অরণ্যে হারিয়ে-যাওয়া তথা পরম্পরাগত সীমার বাইরে দাঁড়িয়ে-থাকা স্ত্রী এবং পুরুষ। বহুধা পরিভাষিত সম্পর্ক থেকে পৃথক। চিরন্তন অনুবন্ধের উল্লিখিত নামের বাইরে সম্পর্কের সৃজন এবং খণ্ডন। অমৃতা অনাদিকাল থেকে সযত্নে লালিত পরম্পরাকে মুহূর্তে খারিজ করেছেন। এই প্রক্রিয়ার অবস্থান্তরই তাঁর সাহিত্য চেতনার কেন্দ্র বিন্দু।”

      বলছেন ডাঃ স্বরণ চন্দর। তাই কি? তিনি আরও বলছেন,

      “'ডাক্টর দেব' (১৯৪৯) থেকে 'কোরে কাগজ' (১৯৮২) অমৃতা ২৬টি উপন্যাস লিখেছেন তেত্রিশ বছরে। বিভিন্ন সমাজে ভিন্ন ভিন্ন স্ত্রী-পুরুষ বিষম পরিস্থিতিতে, বিচিত্র বহু নর-নারীর সম্পর্ক এবং সম্পর্কহীনতার কথা লিখেছেন। সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে মধ্যবিত্ত চরিত্রের কনট্রাডিকশন বা দ্বন্দ্ব। পরিবেশ পরিস্থিতির প্রতিকূলতা নয়-তাঁর চরিত্রগুলি নিজেদের স্বভাব, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভাল-মন্দ সবকিছুর মিশ্রণ নিয়ে পাঞ্জাবী উপন্যাসের ইতিহাসে মাইলস্টোনের সম্মান এনেছে। পরিস্থিতি পরিবেশ উপন্যাসের তাত্ত্বিক ধরাতল মাত্র-কিন্তু মানব জমিন যে, সম্পর্কের হাল দিয়েই কর্ষিত হয় তারই লোকোত্তর কৃষক তিনি।”

      কোরে কাগজ পড়ে আমি সেই জটিলতার আঁচ পাই। কিন্তু সেই আঁচ আমায় জারিত করতে পারে না। কেন পারে না? কারন, প্রথম উপন্যাসটার মতো শেষ উপন্যাসেও, অমৃতার সেই মুন্সীয়ানা আমি পাই না, যা আমি পেয়েছিলাম পিঞ্জর কিম্বা রসীদে টিকট-এ।

      হয়তো, অমৃতা, এর মধ্যে পুরোপুরি কবি হয়ে গেছেন, কিম্বা বিরহী/রোমান্টিক প্রেমিকা কবি হয়ে গেছেন। ফলে, মানব মনের কালো কালো অন্ধকারগুলোকে তিনি কমনীয় নারীত্বে কিম্বা ক্ষময়াসুন্দর চক্ষে, অথবা তৎকালীন সামাজিক রীতিনীতি, কিম্বা আপন মনের সহজাত (!) আত্মশুদ্ধতায়, দেখতা পান নি, কিম্বা দেখতে চান নি।

      এই গল্প একটা ছেলে, যে তার মায়ের মৃত্যুর পর জানতে পারে, তার মা তার আসল মা নন, তার বাবাও তার প্রকৃত বাবা ছিলেন না, সেখান থেক তার জার্নি শুরু হয়, এবং শেষ হয়। এই শুরু আর শেষের মাঝে পঙ্কজের (সেই ছেলেটি) মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে একটা এমন দোলাচল চলে যা এক মিস্টি উপন্যাস হয়, কিন্তু জীবন যন্ত্রণার রূপ সম্পূর্ণ পরিগ্রহ করতে অক্ষম হয়।

      আমি কি একটু বেশিই ভুল ভাবছি?

      জানি না। যার অমৃতা পড়েছেন, তারা বলতে পারবেন। আমার কিন্তু পিঞ্জর আর রসীদে টিকট বাদে তার আর কোন লেখা দাগ কাটতে পারছে না।

      ও হ্যাঁ, কবি অমৃতার কথা আমি বলছি না, আমি বলছি ঔপন্যাসিক অমৃতার কথা, যিনি কি না ছাব্বিশটা উপন্যাস লিখেছেন তার সমগ্র জীবনে।

      অসিত সরকার মহাশয় কিন্তু তার একটা ছোট্ট প্রবন্ধে অমৃতা সম্পর্কে একটা অদ্ভুত দিকনির্দেশ করেছেন। তিনি লিখছেন,

      “সাহিত্যের সব শাখায় অবাধ বিচরণ সত্ত্বেও, কবিতাই অমৃতা প্রীতমকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে সব চাইতে বেশি। আজ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় কুড়িটি। 'শূনেত্বরে' বা 'সংবেদন' কাব্যগ্রন্থের জন্যে তিনি ১৯৫৬ সালে আকাদেমি পুরস্কার পান। ১৯৫৭ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান 'কাগজতে ক্যানভাস' বা 'কাগজ ও ক্যানভাস' কাব্যগ্রন্থের জন্যে! এছাড়াও তিনি যেসব আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন, তা প্রায় সবই কবিতার জন্যে।”

============

কোরে কাগজ

অমৃতা প্রীতম

অনুবাদিকাঃ ছন্দা করঞ্জী চট্টোপাধ্যায়

ভাষা সংসদ

মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০/-

Comments

Popular posts from this blog

যে বুকে আগুন জ্বলে

শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা সম্পর্কে

জেরক্স কপির উন্নত ভার্সানে ‘আবার প্রলয়’ এসেছে