জেন আয়ার - দুটো প্রবন্ধ


 ১

“আমি বড় খুশি, জেন; যখন তুমি শুনবে আমি আর নেই, আমার জন্য দুঃখ কোরো না। দুঃখ পাওয়ার ব্যাপারই নয় এ। আমাদের সবাইকেই তো একদিন মরতে হবে; আর যে অসুস্থতা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে, তা ব্যথাহীন; খুব ধীরে ও কোমল স্পর্শে সে আমাকে টানছে; আমার মনে কোনো গ্লানি বা অশান্তি নেই। আমার পেছনে এমন কাউকে রেখে যাচ্ছি না, যে আমার জন্য শোক করবে। আমার শুধু বাবা আছেন, কিন্তু তিনিও হালে বিবাহ করেছেন, তাই আমার জন্য বিশেষ শোক করার সময় তাঁর হবে না। অল্প বয়সে এভাবে মারা গিয়ে আমি ভবিষ্যৎ জীবনের অনেক দুঃখ-কষ্টকে এড়াতে পারব। এই পৃথিবীতে অনেক ওপরে যাওয়ার জন্য আমার বিশেষ কোনো প্রতিভা ছিল না; সারাজীবন সবার কাছে আমি দোষী হয়েই থাকতাম।”

সাহিত্যে কালোত্তীর্ণ গল্প–উপন্যাস–কবিতা–প্রবন্ধ নিয়ে রিভিউ করার ধৃষ্টতা দেখানো আমার কম্ম নয়। কিন্তু আজ যদি আমি সেইসব কালোত্তীর্ণ লেখার সামনে এসে দাঁড়াই, কী লিখব তাদের নিয়ে? এই যেমন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে সম্প্রতি যে সিনেমা হল, তা ভালো–খারাপ ব্যতীত আমি দেখছি; কুসুমের ব্লাউজের নিচে মন আছে কি নেই, থাকলে তা ফ্রয়েডিয়ান না বাঙালীয়ান—তা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই বাঙালি এখনও দিন কাটাচ্ছে, আর সিনেমাটা নিয়ে ‘আহা-উহু’ করছে। অথচ উক্ত উপন্যাসে কত যে পার্শ্বচরিত্র আছে, যারা বর্ণময়, অথচ কুসুমের আঁচলে বন্দী!

আমি তাই এই সব চরিত্রদের নিয়েই লিখব ভাবলাম—যা আমার মনে দাগ কেটেছে। কারণ, পার্শ্বচরিত্রেরাই মূল চরিত্রের নির্মাণের আপ্তসহায়ক।
      আমি পড়ছি শার্লট ব্রন্টির লেখা মরমী উপন্যাস—জেন আয়ার

উক্ত সংলাপটি মরণোন্মুখ হেলেন বার্নসের। বয়স কত তোমার, হেলেন?
“মেয়েটির বয়স তেরো বছরের বা তার থেকে একটু বেশিই হবে।”

হেলেন যেন বাইবেল থেকে উঠে এসেছে—সাহিত্যের মাটিতে এক পরাবাস্তবতা; আর সেই কারণেই তার চরিত্র এত দৃষ্টিকটু। জেনের সাথে তার কথোপকথনে উঠে আসে বাইবেলের সাথে বাস্তবতার দৃষ্টিকোণিক পার্থক্য।

হেলেন বলে, “আজ সকালে যখন ক্লাস চলছিল, আমি তোমাকে লক্ষ্য করছিলাম। দেখলাম তুমি খুব মনোযোগী, তোমার চিন্তাধারা কখনও এদিক–ওদিক ঘুরে বেড়ায় না, তুমি একমনে মিস মিলারকে শুনছিলে, যখন উনি পড়া বোঝাচ্ছিলেন আর তোমাকে প্রশ্ন করছিলেন। এবার, আমার ভ্রাম্যমাণ চিন্তারা কেউ আমার দখলে থাকে না, যখন মিস স্ক্যাচার্ড পড়া বোঝান; আর আগ্রহ ও পরিশ্রম সহকারে তাঁর কথাগুলো স্মৃতিতে সংগ্রহ না করে আমি এমন অমনোযোগী হয়ে যাই যে আমি তাঁর গলার আওয়াজও শুনতে পাই না। আমি দিবাস্বপ্নে হারিয়ে যাই। কখনও আমি ভাবি যে আমি নর্থাম্বারল্যান্ডে আছি, আর চারদিকে যে শব্দের গুঞ্জন, সে আর কিছু না, ছোট ঝরনার কাকলি, যা আমার বাড়ির কাছে ড্রেনের মধ্য দিয়ে প্রবহমান।”

জেনের সাথে হেলেনার এই কনট্রাস্ট জেনকে সমগ্র উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। আমরা বলি, উঁচু গলায় স্পষ্ট কথা স্পষ্ট করে বলা—জেন তা লাভ করেছিল নিজে থেকেই—
      “আমাকে বলতেই হবে; আমার ওপর অত্যন্ত বেশি অত্যাচার চালানো হয়েছে। এবার আমাকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? আমার বিরোধীকে প্রতি আক্রমণ করবার মতো আমার জোর কোথায়?”

জেনের শাস্তি একটাই—লোউড ইনস্টিটিউশন। সেখানেই তার বন্ধুত্ব হেলেনের সাথে। কোথায় কনট্রাডিকশন করছে হেলেন?

“…তুমি মানুষের ভালোবাসার ব্যাপারে একটু বেশি স্পর্শকাতর, তুমি খুব আবেগপ্রবণ; আবেগ ভীষণরূপ ধারণ করে তোমার; সেই সর্বশক্তিমান, যিনি তোমাকে তৈরি করেছেন, তোমার আত্ম-অনুভূতি ছাড়াও আরও উপযোগী বস্তু দিয়েছেন। এই পৃথিবী এবং তার ভেতরের মানবজাতি ছাড়াও এক অদৃশ্য আত্মার জগৎ আমাদের চারদিক ঘিরে আছে, সর্বত্র, সবসময়; আর সেই দেবদূতের মতো আত্মারা আমাদের লক্ষ্য করেন, কারণ আমাদের রক্ষাকর্তা তাঁরা। আর যখন আমরা কষ্টে, লজ্জায়, অপমানের আঘাতে জর্জরিত হয়ে মৃতপ্রায় হই, যদি বিদ্রুপ ও ঘৃণা দ্বারা অকারণে আক্রান্ত হই, দেবদূতেরা আমাদের যন্ত্রণা লক্ষ্য করেন। আমরা নিরপরাধ হলে আমাদের পবিত্রতা তাঁরা বুঝতে পারেন অবশ্যই (যদি পবিত্র আমরা হই; যেমন আমি জানি, মি. ব্রকহার্স্টের মিসেস রিডের কাছে শোনা কথা থেকে তোমাকে এত আড়ম্বর সহকারে অপরাধী বলে দাগিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তুমি নিরপরাধ, কারণ আমি তোমার উৎসাহী চোখে ও তোমার সুনির্মল চেহারায় তোমার একাগ্র নিষ্ঠা দেখেছি)। ঈশ্বর সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করেন, যখন আমাদের আত্মা আমাদের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, তখন তিনি তাঁর পুরস্কার দেন। তাহলে, আমরা দুঃখে এত কাতর হয়ে পড়ব কেন, যখন জানি জীবন খুব ছোট, মৃত্যু সুনিশ্চিত, আর তারপরেই অনন্ত আনন্দ ও সুখ...?”

জীবন খুব ছোট, হেলেন, তোমার জীবন খুব ছোট। আর তাই কি তুমি এমনভাবে বাইবেলের পাতা থেকে উঠে এসেছ? এমন অস্বাভাবিক শুদ্ধ তুমি? এই শুদ্ধতার উৎস আসলে কি অভ্যন্তরীণ শান্তি, না ধর্মীয় বশীভূততা?

বসন্তের রাত। ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হেলেনের সাথে দেখা করতে চলেছে জেন। অন্তত একটিবারের মতো যদি দেখা যায় তাকে! লুকিয়ে লুকিয়ে চলেছে সে। এ এক মরণাভিসার। তার ঘরে তখন কেউ নেই। জেন আশঙ্কিত। মশারির আড়ালে থাকা হেলেনকে সে প্রশ্ন করে, “জেগে আছ?”

      বেঁচে আছে হেলেন।
      “সে যেন একটু নড়ে উঠল, পর্দাটা সরাল, আর এবার তাকে দেখতে পেলাম। বিশীর্ণ, রক্তহীন, কিন্তু শান্ত; তার বিশেষ কোনো পরিবর্তন না দেখে আমার সব ভয় নিমেষে দূরীভূত হল। …সে মোটেই মৃত্যুর অপেক্ষায় নেই, সবাই ভুল বুঝছে; তাহলে সে এত শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন ভাবে কথা বলতে পারত না, ও এমন শান্তও থাকতে পারত না। আমি তার খাটের পাশে গিয়ে তাকে চুমু খেলাম; তার কপাল বেশ ঠান্ডা, আর তার সরু গালও বেশ ঠান্ডা, তার হাতও তাই, কিন্তু সে পূর্বের মতোই হাসল।”

“আমার ঘুম পাচ্ছে, জেন; কিন্তু আমি ঘুমিয়ে পড়লেও আমাকে ছেড়ে যেও না, জেন। তুমি কাছে থাকলে আমার ভালো লাগবে।” দুই বন্ধু, লেপের উষ্ণতায় একে অপরকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

জেন নিশীথনিদ্রায়। হেলেন মরণনিদ্রায়।

শার্লট ব্রন্টির ভাষায়, বাংলা করলে হয় এমন—
      “দু'একদিন পর জানতে পারলাম, মিস টেম্পল ভোরের দিকে ঘরে এসে আমাদের আবিষ্কার করেন; হেলেনের খাটে শুয়ে তার কাঁধে মুখ গুঁজে আমি, তার গলা জড়িয়ে আমার হাত। আমি নিদ্রিত, হেলেন মৃত। ব্রব্রিজ চার্চের উঠোনে তার কবর; পনেরো বছর ধরে শুধু যা ঘাসের আস্তরণেই ঢাকা ছিল; কিন্তু এখন ধূসর মার্বেল ফলকে স্থানটি চিহ্নিত করা তার নাম দিয়ে। সেখানে লেখা—‘Resurgam’; আমি আবার আসব।”

গভর্নেস কি?

গভর্নেস হল বিশেষত পাশ্চাত্য পরিবারে নিয়োজিত ব্যক্তিগত শিক্ষিকা। সাধারণত ৫১৬ বছর বয়সী শিশুদের পড়াশোনা, শিষ্টাচার, আর সাংস্কৃতিক শিক্ষার দায়িত্বে তারা থাকতেন। এনারা শিক্ষিত, কিন্তু গরিব বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভদ্র পরিবারের হতেন, এবং এই মহিলারা প্রধানত জীবিকার জন্য কাজ করতেন।

 

কিন্তু সমস্যাটা কোথায়?

গভর্নেসরা একেবারে চাকরের মতো নন। তাদের সামাজিক মর্যাদা ছিল বটে, কিন্তু তাঁকে পরিবারের সমান ভাবা হতো না। তাই তারা অতিথিদের মতো বসে গল্প করতে পারতেন না, আবার ভৃত্যদের সঙ্গেও মিশতে পারতেন না। এই ‘মধ্যবর্তী অবস্থানটাই অনেক সময় তাঁকে নিঃসঙ্গ করে তুলত। এর সাথে যুক্ত হত সেই পরিবারের মহিলাদের ঈর্ষা। কারণ, এনারা যথেষ্ট রকমের শিক্ষিতা ছিলেন, তাদের তুলনায়। ফলে, মাঝে মাঝে বাড়ির কর্তাব্যাক্তিদের সাথে তাদের একটু ‘ইয়ে’ হয়ে যেত। অনেকে বিয়েও করে নিতেন। এরা তাই এলিট সম্প্রদায়ের কাছে, বিশেষত, মহিলা ও শিশুমহলে খুব একটা সমাদর পেত না।

‘জেন আয়ার’ উপন্যাসে আসা যাক ---

“এ ব্যাপারে ওনাকে আমার সুপুর্দ করার কোনও দরকার নেই। এক কথায় বলতে পারি ওদের জাতটাই একটা বিরাট আপদ বিশেষ। এমন নয় যে তারা আমাকে বেশি বিরক্ত করতে পেরেছে, বরং আমিই তাদের জ্বালাতন করেছি। থিওডোর আর আমি মিস উইলসন, মিসেস গ্রে আর ম্যাডাম জোবার্টদের খুব ঘোল খাইয়েছি। মেরী তার শান্ত, ঘুমন্ত স্বভাবের জন্য খুব একটা যোগদান করতে পারেনি। সবথেকে বেশি মজা হয়েছিল ম্যাডাম জোবার্ট-এর সঙ্গে। মিস্ উইলসন্ বেচারা দুর্বল মহিলা, সবসময় বিষণ্ণ কাঁদো কাঁদো ভাব - ওকে বিরক্ত করে কোনও মজা ছিল না; মিসেস গ্রে স্থূলরুচির মহিলা, বোধবুদ্ধি কম; কোনও আঘাতই তাকে বিপর্যস্ত করত না। কিন্তু বেচারী ম্যাডাম জোবার্ট! আমি এখনও তাকে দেখতে পাই, আমরা যখন তাকে বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে দিতাম - তীব্র ক্রোধে উন্মত্ত, চা ফেলে দিয়ে, রুটিমাখন চটকে নষ্ট করে, বইপত্র সিলিং-এ ছুঁড়ে ছুঁড়ে, ডেস্ক ও রুলার ছোঁড়াছুঁড়ি করে, এমনকি ফায়ারপ্লেসের ঝাঁজরি ও আগুন খোঁচানোর লাঠি কিছুই বাদ যেত না। থিওডোর সেইব দারুণ মজার দিনের কথা মনে পড়ে?”

"হ্যাঁ, খুব ভালো করে।" দীর্ঘ টানে বলে উঠল লর্ড ইনগ্রাম; "আর বেচারী বুড়ি চিৎকার করে উঠত "শয়তানের বাচ্চারা!" - "আর তারপর আমরা তাকে ভালো করে শিক্ষা দিতাম, তার মতো মুখ্যুসুখ্যু লোকের আমাদের মতো বুদ্ধিমান বাচ্চাদের শিক্ষা দেওয়ার কথা ভাববার মতো ঔদ্ধত্যের জন্য।"”

এই ‘আপদ-বিশেষ’ জাতেদের অভিজ্ঞতা কি? জেন আয়ারের লেখিকা শার্লট ব্রন্টি নিজে ছিলেন গভর্নেস। তিনি চিঠি লিখছেন Ellen Nussey-কে, ১৮৩৯ সালে --- “I am always tired – the day begins at seven and ends at eleven, without a moment of rest in between.” সেডউইক পরিবারে গভর্নেস থাকাকালীন তার বক্তব্য, “I have three pupils: one noisy, one slow, and one wholly inattentive – to keep them all in line is like holding three wild ponies on a single rein.”

জেন আয়ারে কি দেখি? অ্যাডেল সম্পর্কে তার কি মত? “দেখলাম আমার ছাত্রী খুবই শান্ত, পড়ায় বিশেষ মনোযোগ নেই, নিয়ম করে কোনও কাজে মনঃসংযোগ করতে সে অভ্যস্ত নয়। … আমার ছাত্রীটি উজ্জ্বল প্রকৃতির, আদর দিয়ে তাকে যথেষ্ট নষ্ট করা হয়েছে, যার জন্য কিছুটা বেপরোয়া; তবে যেহেতু সে সম্পূর্ণ আমার হাতে এবং কোথাও কোনও অন্যায় দখল দেওয়ার চেষ্টাও হয়নি আমার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে, তাকে আজ্ঞাকারী সুষম ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে গড়ে তোলাতে, সে শীঘ্রই তার ছোটখাটো দুষ্টুমি ভুলে গেল। সে কোনও বিশেষ প্রতিভার অধিকারী ছিল না, চরিত্রের কোনও অসাধারণত্বও না, এমন কোনও আশ্চর্যজনক অনুভূতির তীব্রতা বা রুচির সৌকর্য ছিল না যা তাকে অন্যের থেকে আলাদা করতে পারে, তবে তার চরিত্রে এমন কোনও দুর্বলতা বা নৈতিক অবনতির চিহ্নও ছিল না যা তাকে সাধারণের থেকে নীচে নামিয়ে আনতে পারে। সে মোটামুটি উন্নতি করছিল, আমার জন্য বেশ উচ্ছ্বসিত, যদিও খুব গভীর নয়, ভালোবাসা তার; তার সরলতা, অনির্বার কথা বলা ও তার আমাকে খুশি করবার চেষ্টা তাকে ভালোবাসতে প্রেরিত করেছিল আমায়, ফলে আমাদের দু'জনের এক সাধারণ সামীপ্য গড়ে উঠেছিল যাতে আমরা দু'জনেই সন্তুষ্ট ছিলাম।”

­­­­শার্লটের আরেকটা চিঠি থেকে পাওয়া যায় – “They treat me civilly, yet I feel I belong to neither the servants nor the family; I sit alone in the evenings.”

আর উপন্যাসে? গভর্নেসের সম্পর্কে ধারনা কি? “…আমাদের ছোটবেলায় প্রায় এক ডজন গভর্নেসের আসা যাওয়া দেখেছি। তাদের অর্ধেকই ঘৃণ্য ও বাকিরা হাস্যকর তাই না মা?' … গভর্নেসদের কথা আমার কাছে জানতে চেও না। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। তাদের অযোগ্যতা ও মনমর্জির জন্য আমাকে অনেক ভুগতে হয়েছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে এখন ও পাট চুকেছে।“ … মিসেস ডেন্ট এইসময় ঝুঁকে পড়ে তাঁর কানে নীচুস্বরে কিছু বললেন, বোধকরি তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন যে শাপগ্রস্ত ওই প্রজাতির একজন এখানে বিদ্যমান।

তাচ্ছিল্যের সঙ্গে লেডি বলে উঠলেন "এসব শুনে একটু ভালো শিক্ষা হবে তার।তারপর একটু গলা নামিয়ে ততটাই যাতে আমি শুনতে পারি - "আমি লক্ষ্য করেছি ওকে, আর আমি চেহারা দেখে চরিত্র বিশ্লেষণে পারদর্শী-ওর মধ্যে আমি সেই সমস্ত দোষগুলি দেখেছি যা ওই শ্রেণির সকলের মধ্যে থাকেই।”

তৎকালীন গভর্নেসদের কাজ কি ছিল? শার্লট ব্রন্টির চিঠিতে পাওয়া যায় ---

“সকাল সাতটায় ঘুম ভাঙল, কিন্তু নিজের কোনো প্রস্তুতির সময় নেই। তাড়াতাড়ি পোশাক পরে মিসেস [গৃহকর্ত্রী]-এর বাচ্চাদের পোশাক পরিয়ে দিতে শুরু করলাম। তাদেরকে চুল আঁচড়াতে শেখানোতারা চিৎকার করছে, কেউ চিরুনি ফেলে দিচ্ছে, কেউ চুলে গিঁট পাকাচ্ছে।

আটটায় প্রাতঃরাশের টেবিলেএখানেও আমার শান্তি নেই, কারণ প্রতিটি কামড়ের মাঝেই আমাকে মনে করাতে হচ্ছে কে কীভাবে ছুরি-চামচ ধরবে। এক ছোট মেয়ে রুটি কেটে ফেলছে আঙুলের কাছে, আরেকজন চামচ মুখে ঢুকিয়ে খেলছে।

তারপর সকাল ন’টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত পড়ানোমাঝে এক মুহূর্ত থামা নেই। একজনকে বানান শেখাচ্ছি, আরেকজন ভুল করে কান্না শুরু করেছে। ফরাসি শেখাতে গিয়ে বারবার ইংরেজি উত্তর শোনার পর আমার মাথা ব্যথা শুরু হয়।

মধ্যাহ্নভোজের সময়ও শান্তি নেইআমি যেন এক প্রহরী, সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা দেখতে হয়।

বিকেলে তাদের নিয়ে হাঁটতে বেরোলাম, কিন্তু বৃষ্টি নামায় ভেতরে ফিরে আসতে হলো। ঘরে ফেরার পর তারা লাফাচ্ছে, চেঁচাচ্ছেএতে আমার গলার স্বর ভেঙে যাচ্ছে।

রাত আটটায় তারা শুতে গেল, কিন্তু আমি তখনও মুক্ত নইআজকের কাজের হিসাব লিখতে হবে, আগামীকালের পাঠের জন্য নতুন উপকরণ বানাতে হবে।

রাত এগারোটায় বিছানায় গেলামএত ক্লান্ত যে চোখ বন্ধ হওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়লাম। মনে হয়, এই বাড়িতে আমি যেন নিজের জন্য বাঁচি না, শুধু তাদের জন্যই।”

     

এই উপন্যাস গভর্নেসের প্রেমকাহিনী-ই শুধু নয়, এক গভর্নেসকে কেন্দ্র করে তৎকালীন গভর্নেসদের সামাজিক অবস্থানকেও সমানভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।

================

জেন আয়ার
শার্লট ব্রন্টি
অনুবাদক: কেয়া মজুমদার
পরম্পরা পাবলিকেশন
মূল্য: ৭০০/-

 

===================

জেন আয়ার
শার্লট ব্রন্টি
অনুবাদক: কেয়া মজুমদার
পরম্পরা পাবলিকেশন
মূল্য: ৭০০/-

 

Comments

Popular posts from this blog

যে বুকে আগুন জ্বলে

শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা সম্পর্কে

জেরক্স কপির উন্নত ভার্সানে ‘আবার প্রলয়’ এসেছে