ঈশ্বরের খোঁজে, আঙ্কিক পদার্থবিদ্যার পথে পথে

 



আমাকে যে কয়েকটা শব্দ সবথেকে বেশি ভাবিয়েছে, তার মধ্যে ‘ঈশ্বর’ একটা শব্দযখন টিন এজ বয়সে ছিলাম, আমার, আর চার-পাঁচজন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীর মতোই মনে হত, ঈশ্বরের অস্তিত্ব কেবলমাত্র অন্ধবিশ্বাসে। তারপর যখন পড়াশোনা আরেকটু এগোলো, বিজ্ঞানের হাত ধরে, যত এগোতে লাগলাম, দেখলাম, বিজ্ঞানের চোখে ঈশ্বরের কনসেপ্টটা একটু অন্যরকম। বিজ্ঞান ঈশ্বরকে স্বীকার করে না, অস্বীকারও করে না। যে ঈশ্বর দশহাত, কিম্বা দুইহাত, কিম্বা একটা বিমূর্ত আবহ নিয়ে ধর্ম ও দর্শনে প্রতিভাত হয়, বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণটা তার থেকে একটু অন্যরকম। আমি মূলত যে বইটা পড়ে উঠলাম, The God Equation, সেই বইটার কথা বলতে হলে, মূলত পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়েই কথা বলব।

      সে বিষয়ে আসার আগে কয়েকটা মনের কথা আগে বলি। ‘ঈশ্বর’ ব্যাপারটাই মূলত কল্পনাপ্রবণ মানুষের মন থেকে এসেছে। প্রাচীন মানব সম্প্রদায়কে দেখলে, বোঝা যায়, ঈশ্বর একটা গল্প, যে গল্প তাদের একজোট করে, সমাজ বন্ধনে আবদ্ধ করে, মানব সম্প্রদায়কে ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’ রাখতে সাহায্য করে। ক্রমশঃ মানব সম্প্রদায় ভাগ হয়ে যায়, গল্পের তারতম্য পালটায়, বোধ-রুচি পালটায়, ঈশ্বরানুভূতিও পাল্টে যায়। কেউ বলে তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম্‌, কেউ বলে তিনি বিশিষ্টাদ্বৈত, কেউ বলে “একং সৎ বিপ্রা বহুধা বদন্তি, আবার সাংখ্য কিম্বা বুদ্ধ তো ঈশ্বরকেই অস্বীকার করে ফেলল। মানুষ মাঝখান থেকে বহু সমাজ আর প্রথায় বিভক্ত হয়ে গেল।

যারা ঈশ্বরকে দেখতে চেয়েছেন, স্পর্শ করতে চেয়েছেন, তারা তাকে পেতে চেয়েছেন লজিক কিম্বা আবেগের বোধের মধ্যে দিয়ে। এর মধ্যে ‘লজিক’ বড়ো সব্বোনেশে ব্যাপার। এই ‘লজিক’ ঈশ্বরকে একই সাথে ‘আছে’ এবং ‘নেই’ দুই তত্ত্বে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে। এবং অবশেষে বোঝা গেছে, দুটো তত্ত্বই একই মুদ্রার এপিঠ এবং ওপিঠ --- হেড এবং টেল।

যারা তত্ত্বে তাকে বুঝতে চেয়েছেন, তাদের অধিকাংশই বিজ্ঞানের ধারাতে এগিয়েছেন। সেখানেও অনেক মত, অনেক পথ --- পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, জীববিদ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। একটা কথা বুঝে নিতে হবে তারা কিন্তু আসলেই অস্বীকার করেন নি। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, তিনি আছেন; কেউ কেউ বলেছেন, তিনি নেই। দুটো তত্ত্বই অবশেষে পাকাপোক্ত বা সর্বজনগ্রাহ্য হতে পারে নি। এর বাইরে যারা আছেন, তারা এখনও খুঁজে চলেছেন। আমার মনে হয়, ঈশ্বর অর্থে ‘অন্তিম’, যার পর আর কিছু নেই। যে অন্তিমে তিনি আছেন, সমস্ত কিছু যে অন্তিমে এসে শেষ হয়, মিশে যায়, তাতেই মিশে যায়তিনি ‘অন্তিম বান্ধব’। মিশিও কাকু সেই দলে পড়েন, উপরোক্ত বইয়ের জনক।

আসলে পদার্থ নিয়ে যাদের কারবার, তারা জানেন, এই বিদ্যার অন্তিম দশা এখনও আসে নি তারা অন্তিম দশায় পৌছতে চেষ্টা করছেন মাত্রতারা মানেন, এই অন্তিম দশাতেই ঈশ্বরের অবস্থান, এই অন্তিম দশাতেই ঈশ্বরের স্বরূপ প্রকটিত হবে, কিম্বা স্বরূপের সত্য-মিথ্যা প্রমাণিত হবে।

কিন্তু, পদার্থবিদ্যা কিভাবে এগিয়েছে? এই বই তারই গল্প বলে। আমি না হয় সূত্রধার হয়ে যাই, আপনাদের মধ্যে কারও যদি কৌতুহল হয়, তাহলে, একবার পড়ে দেখতে পারেন, এমন কিছু শক্ত ব্যাপার নয়, বারো ক্লাসের বিজ্ঞানবিদ্যা দিয়ে অনায়াসলব্ধ এই বইটা।

      মূলত ‘ব্রহ্মান্ড’ পদার্থ, যাকে ভাঙলে ভর এবং শক্তি পাওয়া যায় --- এই দুটো দিয়েই তৈরী। ভর = কণা, যার প্রবক্তা ডেমোক্রিটাস; এবং শক্তি = তরঙ্গ, যার প্রবক্তা পিথাগোরাস। ঠিক এইখান থেকে পদার্থবিদ্যা মূলত দুটো ভাগে, সমান্তরালভাবে এগোতে থাকে। নিউটন এসে এমন একটা বিষয়ের দিকে মোড় ফিরিয়ে দেন, যা পরবর্তীকালে পদার্থবিদ্যার ইতিহাসের মূল স্তম্ভ হয়ে থাকে, তা হল বল বা Force (ফোর্স) দেখা যায়, যখন যখনই নতুন কোন ফোর্স আবিস্কার হচ্ছে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে মানব সমাজ ধাপে ধাপে নয়, লাফে লাফে এগিয়ে যাচ্ছে। এবং অবশেষে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীতে মোট চারটি ফান্ডামেন্টাল ফোর্স আছে---

১। মোশান ফোর্স à আইজ্যাক নিউটন

২। গ্র্যাভিটেশনাল ফোর্স à আইজ্যাক নিউটন

৩। ইলেকট্রিক এন্ড ম্যাগনেটিক ফোর্স à জেমস ম্যাক্সওয়েল

৪। স্ট্রং এন্ড উইক নিউক্লিয়ার ফোর্স à ফ্র্যাঙ্ক উইলকজেক এবং এনরিকো ফার্মি

বিজ্ঞানীদের, এবার এই চারটে ফোর্সকে একত্রীকরণ করা প্রয়োজন, অর্থাৎ এবার দরকার সব তত্ত্বের মূলতত্ত্ব --- থিওরি অফ এভরিথিংসে সময়ে বিশ্ব দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আইনস্টানের রিলেটিভিটির তত্ত্বকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে কোয়ান্টাম তত্ত্ব। দুই তত্ত্বে রীতিমতো চাপান-উতোর চলছে। এবং, সব ফোর্সকে একত্রীকরণ করতে গিয়ে যে ফোর্স বাদ সাধছেন, সেটি হল গ্র্যাভিটি। এই ফোর্সকে কিছুতেই আয়ত্তে আনা গেল না, এমনকি আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির থিওরিও ব্ল্যাক হোল, বিগ ব্যাং-এর ঘটনাগুলোকে ব্যখ্যা করতে পারলেও আঙ্কিক দৃষ্টিকোণে ব্যর্থ হল মূলত এই গ্র্যাভিটেশানের কাছে এসে।

এই সময়ে কোয়ান্টাম তত্ত্ব এর সমাধান করল খানিকটাদেখা গেল, কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স এই কারেকশান করতে পারছে কিন্তু থিয়োরি অফ এভরিথিং? না, পাওয়া গেল না। মনে করা হল গ্রাভিট্রন নামক কণা পাওয়া গেলে হয়তো এর সমাধান সম্ভব। পাওয়া যায় নি এখনওএই সময়ে ইয়ং-মিলের তত্ত্বের হাত ধরে এল স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এবং তার পর এলো বহু বিতর্কিত থিওরি, দ্য স্ট্রিং থিওরি।

স্ট্রিং থিওরি কিন্তু পরিত্যাজ্য হয় নি। এই থিয়োরিকে, মনে করা হয়, একটা পথ। এই থিওরির সবচেয়ে বড়ো সমস্যা, এই থিওরি বলে বিশ্বব্রহ্মান্ড চারটে ডায়মেনশানে নয়, দশটা ডায়মেনশানে তৈরী। বাকি ছটা ডায়মেনশান এতই ছোট, যে সাব এটমিক পার্টিকেলও সেখানে ঢুকতে পারে না। কিন্তু তরঙ্গ? সে তো আছে, তরঙ্গ দিয়ে ধরতে পারলেই কিস্তিমাত। ধরা পড়েনি এখনো। বরং M-থিওরি এসে তার হাত ধরেছে। এবং এই থিওরির দাবী, ব্রহ্মান্ড এগারো ডায়মেনশানের।

‘থিওরি অফ এভরিথিং’ কেন এত প্রয়োজনীয়? আগের থিওরিগুলোর মতই, এই থিওরি যদি প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে, পদার্থবিজ্ঞানীদের মতে, ব্রহ্মান্ডের সমস্ত উত্তর মিলবে। এর কোন প্রযুক্তিগত সাহায়তা হয়তো মিলবে না, কিন্তু দর্শনগত উত্তর ভবিষ্যত প্রযুক্তির হাত ধরতে পারে বৈ কি। হাইপারস্পেস, মাল্টিভার্স, টাইম ট্র্যাভেল, প্যারালাল ইউনিভার্স, ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার, এমনকি ঈশ্বর!

ঐ যে বলেছিলাম না, ঈশ্বর আমাদের ‘অন্তিম’ লক্ষ্য। অন্তিম বলেই একমাত্র লক্ষ্য। আর এই একমাত্র লক্ষ্য পদার্থবিদ্যায় নিহিত আছে Theory Of Everything-এ। এই বইটা যত পড়ছিলাম, এই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার ইতিহাস পড়ছিলাম, আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্যে মানুষের কি মরণপন চেষ্টা! জলের মাছ যদি জলকে জানতে চায়, দেখতে চায়, সম্যক বুঝতে চায়, তাহলে যে অবস্থা, বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞানীদেরও একই অবস্থা। আর পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল, গীতার সেই অমোঘ শ্লোক---

আশ্চর্যবৎ পশ্যতি কশ্চিদেনম্ আশ্চর্যবদ্ বদতি তথৈব চান্যঃ

আশ্চর্যবচ্চৈনমন্যঃ শৃণোতি শ্রুত্বাপ্যেনং বেদ ন চৈব কশ্চিৎ ২৯/

কেউ এই আমাকে আশ্চর্যবৎ দর্শন করেন, কেউ আশ্চর্যভাবে বর্ণনা করেন এবং কেউ আশ্চর্য জ্ঞানে শ্রবণ করেন, আর কেউ শুনেও তাকে বুঝতে পারেন না

ঈশ্বর লুকিয়ে আছেন অঙ্কে, তিনি মিলবেনও অঙ্কে, পদার্থবিজ্ঞানীদের সপাট জবাব সত্যিই তো, অঙ্ক এমন এক বিষয়, যার কোন বাস্তব অস্তিত্বই নেই। মজার ব্যাপার নয় কি? বিমূর্তকে ধরতে হলে, এতএব, বিমূর্তই ভরসা।

===============================

The God Equation: The Quest for a Theory of Everything

Michio Kaku

Penguin Publication

397/-

Picture Curtesy: Samarpita

Comments

Popular posts from this blog

যে বুকে আগুন জ্বলে

জেরক্স কপির উন্নত ভার্সানে ‘আবার প্রলয়’ এসেছে

শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা সম্পর্কে